প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গণপূর্তের বদলি-টেন্ডারে প্রভাবশালী বলয়, তিন প্রকৌশলীকে ঘিরে যত অভিযোগ
মো: মনির হোসেন পাটোয়ারী, রিপোর্টার ||
বদলি-পদায়ন,
টেন্ডার, পদোন্নতি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন- গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্তে একটি প্রভাবশালী বলয়ের
বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের
অভিযোগ রয়েছে। অধিদপ্তরের ভেতরে এ বলয়টি ‘তিন
পাণ্ডব’ নামে পরিচিত বলে
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর
ঘনিষ্ঠ তিন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সংস্থাপন শাখার মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১
থেকে সম্প্রতি বদলি হওয়া মোহাম্মদ
বদরুল আলম খান এবং
ঢাকা সার্কেল-২-এর ড.
আবু নাসের চৌধুরী।সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ,
এই তিন কর্মকর্তার প্রভাববলয়ের
মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া,
টেন্ডার থেকে কমিশন আদায়
এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ গণপূর্তের মাধ্যমে
করানোর জন্য প্রকৌশলীদের কাছ
থেকে অর্থ সংগ্রহ করা
হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত হওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা না নেওয়া এবং
পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখার অভিযোগও
রয়েছে।প্রকল্প ও টেন্ডারে বদরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগতিন কর্মকর্তার
মধ্যে মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে
অভিযোগের পরিমাণ বেশি। সরকারি বাংলো দ্রুত সংস্কারের কথা বলে টেন্ডার
ছাড়াই পরিচিত ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, প্রকৃত
ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থ
দেখিয়ে তা ভাগাভাগি এবং
বড় প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার
অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।প্রকল্পের অর্থ
ছাড়ে অনিয়ম এবং সরকারি নির্দেশনা
উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে
যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কাজে অনিয়ম, সম্পদ
অর্জন ও নারীঘটিত বিভিন্ন
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসে মন্ত্রণালয়ের
আদেশে তাঁকে বদলি করে রিজার্ভে
পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।সাভার সার্কেলে
দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর আস্থাভাজন
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হেজবুল কবিরকে
গাজীপুরে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তাঁদের অভিযোগ, ওই কর্মকর্তার মাধ্যমে
ঠিকাদারদের সঙ্গে কাজের সমন্বয় এবং পছন্দের ঠিকাদারদের
মধ্যে কাজ ভাগ করে
দেওয়া হতো।সরকারি চাকরির
পাশাপাশি ডেভেলপার ব্যবসা ও সম্পদের মালিকানা
নিয়েও বদরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। উত্তর বাসাবো, উত্তরা ও বাড্ডায় সম্পত্তি
এবং গাজীপুরে জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের
সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার দাবি
করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, এসব সম্পদের কিছু
ভাইবোনের নামে থাকলেও এর
পেছনে বদরুলের ভূমিকা রয়েছে।গাজীপুরের বড়
প্রকল্প ঘিরে
প্রশ্নগাজীপুরে দায়িত্ব
পালনের সময় বদরুলের বিরুদ্ধে
একাধিক প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ
উঠেছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে
রয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকার
কৃষি বিপণন ভবন, ১৫ কোটি
৪১ লাখ টাকার বিএসটিআই
সিভিল, ২০ কোটি ২৪
লাখ টাকার মেট্রোপলিটন সদর থানা, ১৪
কোটি ৬১ লাখ টাকার
সদর উপজেলা মডেল মসজিদ, প্রায়
১০ কোটি টাকার কালিয়াকৈর
থানা, ১৬ কোটি ২৪
লাখ টাকার পুবাইল থানা এবং প্রায়
১৫ কোটি ৮২ লাখ
টাকার কোনাবাড়ী থানা নির্মাণ।গাজীপুরের তাজউদ্দীন
আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অডিটোরিয়াম
নির্মাণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর নির্দেশনা
উপেক্ষা করে অন্য খাতের
অর্থ দিয়ে কাজ চালিয়ে
যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের ঠিকাদারকে প্রায় ৪ কোটি টাকা
অগ্রিম বিল দেওয়া হলেও
নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও
কাজ অসম্পূর্ণ। কাজ শেষ করতে
আরও ৬ থেকে ৮
কোটি টাকা প্রয়োজন হতে
পারে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।মিরপুরের পাইকপাড়া
আবাসিক প্রকল্প এবং পুলিশের ১০৭
থানা নির্মাণ প্রকল্পের ভাসানটেক থানার কাজেও কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ
রয়েছে।এর আগে
ময়মনসিংহে ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়মের
অভিযোগে বদরুলকে ওএসডি করা হয়েছিল বলেও
জানা গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও বেশি কাজ
গণপূর্তের মাধ্যমে করানোর জন্য তহবিল সংগ্রহের
অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।নারীঘটিত অভিযোগে অর্থ
আদায়ের অভিযোগবদরুলের বিরুদ্ধে
নারীঘটিত বিষয় ব্যবহার করে
প্রকৌশলীদের ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের
অভিযোগও করেছেন কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলী। তাঁদের দাবি, পরিচিত নারীদের মাধ্যমে প্রকৌশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার পর বিভিন্নভাবে ফাঁদে
ফেলা হতো। পরে বিষয়টি
মীমাংসার নামে ২০ থেকে
২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত
দাবি করা হতো। পরিস্থিতি
জটিল হলে বদরুল সমাধানের
উদ্যোগ নিতেন বলে অভিযোগ তাঁদের।খুলনা গণপূর্ত
বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম
বলেন, ঢাকায় দায়িত্ব পালনের সময় এক নারী
তাঁকে ফোন করে বিভিন্নভাবে
ব্ল্যাকমেইল করেছিলেন। ওই নারীর সঙ্গে
বদরুল আলমের পরিচয় রয়েছে বলে তিনি শুনেছিলেন।
পরে বিষয়টি সমাধানের জন্য বদরুল তাঁকে
বলেছিলেন।আতিকুলের দাবি,
ওই ঘটনার পর তাঁকে প্রথমে
দায়িত্ব থেকে ক্লোজ করা
হয় এবং প্রায় ছয়
মাস পর খুলনায় বদলি
করা হয়।বদরুল আলমের
বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে
যোগাযোগ করা হলেও তাঁর
সাড়া পাওয়া যায়নি।বদলি-বাণিজ্যে সারোয়ারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নপ্রধান প্রকৌশলীর
ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। বদলি-বাণিজ্য ঠেকাতে
সম্প্রতি মন্ত্রণালয় লটারির মাধ্যমে বদলি শুরু করলেও
লটারির আগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী
সিভিলের ঢাকা জেলার বাক্সে
৪১ জনের নাম যুক্ত
করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।এর আগে
গাজীপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের
১০ লাখ টাকার সিকিউরিটি
মানির পে-অর্ডার অবৈধভাবে
নগদায়নের অভিযোগ ওঠে সারোয়ারের বিরুদ্ধে।
ঠিকাদারের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৫
আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে
অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর সরকারি কর্মচারী
(শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা
অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয়
মামলা করা হয় বলে
জানা গেছে।তবে পরে
শাস্তির পরিবর্তে পদোন্নতি পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাপন
শাখার দায়িত্ব পান তিনি।গত ৩
মার্চ এক দিনে ৫০
জনের বেশি প্রকৌশলীকে বদলি
নিয়েও বিতর্ক হয়। বদলি নীতিমালা
অনুসরণ না করে ওই
আদেশ দেওয়া এবং পছন্দের কর্মস্থলে
পদায়নের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। পরে গৃহায়ন
ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ওই গণবদলি আদেশ
স্থগিত করা হয়।এর আগে
গত বছরের ৯ ডিসেম্বর আর্থিক
লেনদেনের মাধ্যমে কয়েকজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পর
মো. হাসানুজ্জামান, মো. খাইরুল ইসলাম
ও মো. এরশাদুল হকের
বদলি আদেশ স্থগিত করা
হয়। সারোয়ারের বিরুদ্ধে দুদকেও অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।তবে অভিযোগ
অস্বীকার করে সারোয়ার জাহান
বলেন, বদলির সব বিষয় মন্ত্রণালয়
জানে। লটারির বাক্সে আগে থেকেই নাম
রাখার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এসব
কিছু জানি না। মন্ত্রণালয়
বদলি করেছে, তারাই সব জানে।আবু
নাসেরের বিরুদ্ধে শতাধিক অডিট
আপত্তিঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক
প্রকৌশলী ড. আবু নাসের
চৌধুরীকেও প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত করা হয়। অন্য
প্রকৌশলীদের অভিযোগ, তিনি প্রধান প্রকৌশলীর
পরামর্শকের ভূমিকা পালন করেন।তাঁর বিরুদ্ধে
কাজের অগ্রগতির তুলনায় বেশি বিল দেওয়া,
অতিরিক্ত ব্যয় এবং পরিচিত
ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার জন্য
নির্বাহী প্রকৌশলীদের ওপর চাপ সৃষ্টির
অভিযোগ রয়েছে। সরকারি অর্থ অপচয়সহ বিভিন্ন
অনিয়মের অভিযোগে তাঁর সার্কেলের কাজে
শতাধিক অডিট আপত্তি রয়েছে
বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।ঢাকা সার্কেল-২-এর আওতায়
সচিবালয়, হাইকোর্ট ও আশপাশের সরকারি
হাসপাতাল রয়েছে। অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের মেরামতসহ
বিভিন্ন কাজ পরিচিত ঠিকাদারকে
দেওয়ার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীদের
নির্দেশনা দিতেন আবু নাসের। হাসপাতালের
মেরামতকাজের বিল দ্বিগুণ করা
এবং উপবিভাগীয় ও সহকারী প্রকৌশলীদের
মাধ্যমে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিতে কাজ করানোর অভিযোগও
রয়েছে।এসব অনিয়ম
জানার পরও সংশ্লিষ্ট নির্বাহী
প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ
রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বগুড়ায়
দায়িত্ব পালনের সময় টেন্ডার জালিয়াতিসহ
বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।আবু নাসের
চৌধুরী বলেন, স্যার আমাকে বগুড়া থেকে ঢাকা নিয়ে
এসেছেন; কিন্তু কোনো সিন্ডিকেট-অনিয়মের
সঙ্গে আমি জড়িত নই।সচিবের বক্তব্যগৃহায়ন ও
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর
রহমান বলেন, প্রধান প্রকৌশলীর সিন্ডিকেট ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের
বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তাঁরা শুনছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন
জায়গায় লেখালেখিও হচ্ছে। বিষয়গুলো মন্ত্রণালয় পর্যবেক্ষণ করছে।তিনি বলেন,
বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করায় তাঁদের মধ্যে
একজনকে ওএসডি করা হয়েছে। প্রমাণ
পেলে অন্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গণপূর্ত
অধিদপ্তরের বদলি, পদায়ন, টেন্ডার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন
নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের
নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করার
দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কপিরাইট © ২০২৬ Ctn Tv । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত