প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাবিতে ‘শিবিরের স্পাই’ সন্দেহে শিক্ষার্থীকে রাতভর হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ
ফয়সাল আহমেদ সুইট , রিপোর্টার ||
শিবিরের সঙ্গে
সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহীদ শামসুজ্জোহা হলের
এক শিক্ষার্থীকে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ, হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ
উঠেছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিযোগ, তাঁর মুঠোফোন পরীক্ষা
করে শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ খোঁজা হয় এবং তাঁকে
‘শিবিরের স্পাই’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে
জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করা
হয়।গতকাল সোমবার
দিবাগত রাতে শহীদ শামসুজ্জোহা
হলে এ ঘটনা ঘটে
বলে অভিযোগ। গভীর রাতে ওই
শিক্ষার্থীকে হলের প্রভোস্টের কক্ষে
নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পুলিশের কাছে
সোপর্দ করার চেষ্টাও করা
হয় বলে অভিযোগ করেছেন
হলের ভিপি আশিকুর রহমান
সোহাগ।অভিযুক্ত ব্যক্তিদের
মধ্যে রয়েছেন জোহা হল ছাত্রদলের
সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক
সবুজ শাহরিয়ারসহ সংগঠনটির অন্য নেতা-কর্মীরা।
এর আগে শাখা ছাত্রদলের
সাধারণ সম্পাদক সর্দার জহুরুল ইসলাম ও সংগঠনের সমালোচনা
করে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বার্তা দেওয়ার ঘটনায় ফুয়াদের পদ স্থগিত করা
হয়েছিল।ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী
মোহাম্মদ আসিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত
বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের
ছাত্র। তিনি বলেন, পরিবারের
আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় হলে একটি আসনের
জন্য কয়েকবার প্রভোস্টের কাছে আবেদন করেছিলেন।
পরে গণরুমে খালি আসনের বিষয়ে
জানতে গেলে তাঁকে হল
ছাত্রদলের সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়।আসিফের ভাষ্য,
ফুয়াদ তাঁকে ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা বলেন এবং
ছাত্রদল করলে আসন দেওয়ার
কথা জানান। পরিবারের পরিস্থিতির কারণে তিনি আসনের আশায়
ছাত্রদলের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে
রাজি হন।আসিফ অভিযোগ
করেন, সোমবার রাতে ফুয়াদের কক্ষে
গেলে একটি গ্রুপে যুক্ত
করে দেওয়ার কথা বলে তাঁর
মুঠোফোন নেওয়া হয়। ফোনের বিভিন্ন
তথ্য দেখার পর তাঁকে শিবিরের
সঙ্গে যুক্ত এবং ‘শিবিরের স্পাই’
হিসেবে হলে আসার অভিযোগ
করা হয়। বিষয়টি অস্বীকার
করে আসনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ
করলে তাঁকে ধমক দেওয়া হয়।
পরে ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতা-কর্মী সেখানে এসে তাঁকে গণরুমে
নিয়ে যান এবং সেখানে
মারধর করা হয় বলে
তাঁর অভিযোগ।আসিফ আরও
অভিযোগ করেন, মারধরের পরও তাঁকে বিভিন্ন
বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং
শিবিরের ‘স্পাই’ হিসেবে হলে আসার কথা
বারবার বলা হয়। তাঁকে
বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তাঁকে
মেরে ফেললেও কেউ কিছু করতে
পারবে না এবং পুকুরে
ফেলে দেওয়ার মতো কথাও বলা
হয় বলে দাবি করেন
তিনি।ভুক্তভোগীর অভিযোগ,
পরে তাঁর মুঠোফোন ব্যবহার
করে বিভিন্ন ভিডিও ধারণ করা হয়
এবং তাঁকে দিয়ে বিভিন্ন কথা
বলানো হয়। এমনকি তাঁকে
দিয়ে লিখিয়েও নেওয়া হয় যে তিনি
নেতা হতে চান। এভাবে
তাঁর কাছ থেকে একটি
স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন
তিনি।আসিফ বলেন,
আমি এখন খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা কখনো ভাবিনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, আমার বিভাগ ও শিক্ষকদের কাছে সহযোগিতা চাই। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং আমি যেন নিরাপদে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারি।হল
ভিপির বক্তব্যশহীদ শামসুজ্জোহা
হলের ভিপি আশিকুর রহমান
সোহাগ বলেন, রাত প্রায় চারটার
দিকে হলের প্রভোস্ট তাঁকে
তাঁর কক্ষে ডাকেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে
পান, একটি সংগঠনের কয়েকজন
নেতা-কর্মী এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ
করছেন।সোহাগের ভাষ্য,
তিনি হলের ভিপি হিসেবে
নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চান,
গভীর রাতে বাইরের শিক্ষার্থীরা
হলে কেন এবং কী
কারণে ওই শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ
করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, প্রভোস্টের
সামনে ওই শিক্ষার্থীকে পুলিশের
কাছে সোপর্দ করার চেষ্টা করা
হচ্ছিল।সোহাগ বলেন,
কোনো দোষ, অপরাধ বা অভিযোগের সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া একজন শিক্ষার্থীকে কেন পুলিশের কাছে দেওয়া হবে এটা আমার প্রশ্ন। সেখানে প্রক্টরও ছিলেন না। কোনো অভিযোগ ছাড়া একজন শিক্ষার্থীর ফোনও কেন প্রভোস্ট নিজের কাছে নিয়ে রাখবেন, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।যা
বলছেন ছাত্রদল নেতারামারধরের অভিযোগ
অস্বীকার করেছেন জোহা হল ছাত্রদলের
সভাপতি মেহেদী হাসান ফুয়াদ। তিনি বলেন, আসিফকে
তিনি আগে থেকে ভালোভাবে
চিনতেন না। কয়েক দিন
আগে প্রভোস্টের কক্ষের সামনে তাঁদের দেখা হয়। তখন
আসিফ জানান, তিনি প্রায় তিন
মাস ধরে অবৈধভাবে হলে
ছিলেন এবং তাঁর আসনটি
নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া
হয়েছে।ফুয়াদের দাবি,
আসিফ তাঁকে জানান, তাঁর পারিবারিক পটভূমি
বিএনপির এবং ছাত্রদলে নেওয়া
হলে তিনি সংগঠন করবেন।
পরে আসিফের মুঠোফোনের বিভিন্ন তথ্য ও নথি
দেখে তাঁর কাছে মনে
হয়েছে, শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই তাঁকে ওই কক্ষে তিন
মাস অবৈধভাবে রেখেছিলেন।ফুয়াদ বলেন,
রাতে আসিফ তাঁর কক্ষে
এলে ছাত্রদলের গ্রুপে যুক্ত করার জন্য তাঁর
ফোন হাতে নেন। তখন
হল শিবিরের সভাপতি রাফসানের সঙ্গে আসিফের কথোপকথন দেখতে পান বলে দাবি
করেন তিনি। ওই কথোপকথনে আসিফকে
ফুয়াদের সঙ্গে কথা বলার সময়
এবং প্রভোস্টের কক্ষে যাওয়ার আগে ও ভেতরের
কথাবার্তা রেকর্ড করার নির্দেশ দেওয়া
হয়েছিল বলেও দাবি করেন
ফুয়াদ।তাঁর ভাষ্য,
এসব তথ্য থেকে তাঁর
মনে হয়েছে, আসিফকে ব্যবহার করে ছাত্রদলকে বিতর্কিত
করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে
মারধরের অভিযোগ নাকচ করে ফুয়াদ
বলেন, একটি ভিডিওতে আসিফ
নিজেই জানিয়েছেন যে তাঁকে কোনো
ধরনের মারধর করা হয়নি। সেখানে
তিনি ক্ষমাও চেয়েছেন বলে দাবি করেন
ফুয়াদ।রাবি শাখা
ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, আসিফকে
হল ছাত্রদলের সভাপতির কক্ষে পাওয়ার পর ফুয়াদ তাঁকে
ফোন করে কী করা
উচিত জানতে চান। তিনি স্পষ্ট
নির্দেশনা দিয়েছিলেন, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা
যেন না ঘটে এবং
শিক্ষার্থীকে হল প্রভোস্ট ও
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে হস্তান্তর করা
হয়।রাহী বলেন,
অন্যায়ের বিচার করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, তোমাদের নয়। কোনো ধরনের হয়রানি বা অপ্রীতিকর আচরণ ছাড়াই তাকে হল প্রশাসনের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করাই হবে দায়িত্বশীল আচরণের পরিচয়।প্রশাসনের
বক্তব্যবিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর
ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, তিনি তখনো ঘটনাটি
বিস্তারিত জানেন না। বিষয়টি নিয়ে
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে
বৈঠক করেছে। তিনি ওই বৈঠকে
উপস্থিত না থাকায় এ
মুহূর্তে বক্তব্য দিতে পারছেন না
বলে জানান। প্রকৃত ঘটনা জানার পর
তিনি এ বিষয়ে কথা
বলবেন।
এ
ঘটনায় রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের
নেতা-কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
কপিরাইট © ২০২৬ Ctn Tv । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত