আড়াই বছর পর নতুন কোম্পানি আসছে পুঁজিবাজারে, সহজ হচ্ছে তালিকাভুক্তি
দীর্ঘ আড়াই বছরের স্থবিরতা
কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির
পথ খুলতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক
গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি
সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন বিধিমালা প্রণয়নের
উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় করপোরেট
প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজিবাজারে আসার সুযোগ বাড়বে
বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট
ব্যক্তিরা।বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন উদ্যোগ
বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে ভালো
মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের সরবরাহ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের
আস্থা ফেরানো এবং নতুন বিনিয়োগকারী
আকৃষ্ট করার সুযোগ তৈরি
হবে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশীয়
করপোরেট গ্রুপ ও বহুজাতিক কোম্পানি
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।অর্থনীতি বড়
হলেও
পিছিয়েছে পুঁজিবাজারগত ১৫ বছরে
দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় দ্বিগুণ
হলেও পুঁজিবাজারের আকার বেড়ে ওঠেনি;
বরং সংকুচিত হয়েছে বলে মনে করছেন
বাজার বিশ্লেষকেরা। ২০১০ সালের ধসের
পর থেকে বাজারটি প্রত্যাশিত
গতি ফিরে পায়নি। বর্তমানে
বাজারে স্থবিরতার পেছনে অনিয়ম, আইপিও সংকট, সরকারি কোম্পানির শেয়ার ছাড়তে দীর্ঘসূত্রতা এবং সুশাসনের অভাবকে
দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।তাঁদের মতে, বাজারে সুশাসন
নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভালো
ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানো জরুরি। এ পরিস্থিতিতে আইপিও
প্রক্রিয়া সহজ করা এবং
সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ চালুর উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন তাঁরা।তালিকাভুক্তিতে আগ্রহী এক
ডজন
কোম্পানিবিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, পুঁজিবাজারে
শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে সরকারি লাভজনক প্রতিষ্ঠান, দীর্ঘদিন ধরে দেশে ব্যবসা
পরিচালনাকারী বহুজাতিক কোম্পানি এবং বড় করপোরেট
প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া
হয়েছে।ইতোমধ্যে কনফিডেন্স পাওয়ার, টিকে স্টিল, র্যাংকস
পেট্রোলিয়াম, র্যানকম মোটরবাইক লিমিটেড ও ফাইবার অ্যাট
হোমসহ ডজনখানেক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নতুন বিধিমালার আওতায়
এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি ও বিদেশি মালিকানাধীন
কোম্পানিগুলোও আইপিওর পরিবর্তে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পেতে পারে।বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বড় ও প্রতিষ্ঠিত
কোম্পানিগুলো বাজারে এলে শেয়ারের সরবরাহ
বাড়বে এবং পুঁজিবাজারের গভীরতা
বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে
এ উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে
তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া, কোম্পানির আর্থিক মান এবং বাজারে
সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর।‘সুশাসনের অভাবেই পুঁজিবাজার পিছিয়েছে’পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন
অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ আমার দেশ-কে বলেন, ২০১০
সালের ধসের পর বাংলাদেশের
পুঁজিবাজার একধরনের ‘নন-ফাংশনাল মার্কেট’
বা অকার্যকর বাজারে পরিণত হয়েছে, যা কোনোরকমে চলছে।
গত ১৫ থেকে ২০
বছরে দেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ হলেও
পুঁজিবাজারের আকার উল্টো অর্ধেকে
নেমেছে বলে মন্তব্য করেন
তিনি।আবু আহমেদের মতে,
এর মূল কারণ সুশাসনের
অভাব ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা। নতুন
কমিশন ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির
যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাজারের দীর্ঘদিনের
স্থবিরতা কাটাতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা
বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের
(ডিএসই) সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও ডিএসই ব্রোকার্স
অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ)
সাবেক সভাপতি আহমেদ রশিদ লালী বলেন,
বিএসইসির বর্তমান উদ্যোগের ফলে ভালো মৌলভিত্তির
কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসবে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা
ফিরে আসার পাশাপাশি নতুন
বিনিয়োগকারীরাও বাজারে যুক্ত হতে পারেন।আইপিও
বিধি
সংশোধনের উদ্যোগবিএসইসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম আমার দেশ-কে বলেন, পুঁজিবাজারে
শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে পাবলিক ইস্যু রুল সংশোধনের উদ্যোগ
নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের কাজ চলছে। কোম্পানির
সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়টিও কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।তিনি আরও বলেন,
বন্ড বাজার শক্তিশালী করা এবং করপোরেট
বন্ডের প্রবাহ বাড়াতেও কমিশন বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের
ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসানুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাজারে
নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি প্রায় বন্ধ রয়েছে। বিএসইসির
উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভালো কোম্পানির
তালিকাভুক্তিতে দীর্ঘসূত্রতা কমতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত
প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় করপোরেট
প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়া হলে বাজারে মানসম্মত
শেয়ারের সরবরাহও বাড়বে।
নতুন বিধিমালা ও
আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগের
মাধ্যমে পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি আনার
যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে
বাজারে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির
পাশাপাশি সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত
করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।