বাংলা সাহিত্যে ইসলামী সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে কবি গোলাম মোস্তফার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সাহিত্যকর্মের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তাঁদের সম্পর্ক ছিল সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্নেহ-শ্রদ্ধারও।ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ১৯১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতার মোসলেম ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মিলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন। ওই সভায় গোলাম মোস্তফা ‘কবি ও বৈজ্ঞানিক’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন।প্রবন্ধটি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এতটাই ভালো লেগেছিল যে তিনি নিজের গলার হার খুলে গোলাম মোস্তফার গলায় পরিয়ে দেন। পরে প্রবন্ধটি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। সংখ্যাটি ছিল বৈশাখ, ১৩২৫।কবি ও বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের উপসংহারে গোলাম মোস্তফা কবিতার সৌন্দর্য উপলব্ধির বিষয়ে লিখেছিলেনমোটের উপর কবির কবিতা বুঝিতে হইলে কবির মত হইয়া বুঝিতে হইবে। বৈজ্ঞানিকের সার্চলাইট (Search-light) দ্বারা কবিতার সৌন্দর্য্য দেখিতে গেলে, সৌন্দর্য্য ধরা পড়িবে না উহাতে সৌন্দর্যের বিলোপ সাধন করা হইবে মাত্র।তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝান, কোনো সৌন্দর্যকে খণ্ড খণ্ড করে বিশ্লেষণ করলে তার সামগ্রিক সৌন্দর্য অনেক সময় উপলব্ধি করা যায় না। কবিতার ক্ষেত্রেও সৌন্দর্যকে সামগ্রিকভাবে উপলব্ধি করার কথা বলেন তিনি।সাহিত্য পত্রিকায় গোলাম মোস্তফাবঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র প্রথম বর্ষেই গোলাম মোস্তফার বউ কথা কও কবিতা প্রকাশিত হয়।পরবর্তী সংখ্যাগুলোতেও তাঁর একাধিক কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।দ্বিতীয় বর্ষে (১৩২৬) প্রকাশিত হয় ‘আনোয়ারা’ এবং ‘প্রেমের সাধনা’। ‘আনোয়ারা’ ছিল পণ্ডিত নজিবুর রহমানের ‘আনোয়ারা’ উপন্যাসের সমালোচনা।তৃতীয় বর্ষে (১৩২৭) প্রকাশিত হয় ইসলাম প্রচার, ‘ভূষণ’, ‘মরুর মহিমা’ ও ‘শিরচ্ছেদ’। ইসলাম প্রচার’ রচনাটি টি. ডব্লিউ. আর্নল্ডের The Preaching of Islam অবলম্বনে লেখা।চতুর্থ বর্ষে (১৩২৮) প্রকাশিত হয় ‘নববর্ষে’, ‘পরপারের কামনা’ ও ‘প্রার্থনা’।ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৩২৭ সাল পর্যন্ত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। অন্য সম্পাদক ছিলেন ভোলার কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। পরে ড. শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার পদে যোগ দিয়ে ঢাকায় চলে গেলে ১৩২৮ সালে মোজাম্মেল হক এককভাবে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।আল-এসলাম-এও প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর লেখা১৩২২ থেকে ১৩২৬ সাল পর্যন্ত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘আল-এসলাম’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। ওই সময় পত্রিকাটির বিভিন্ন সংখ্যায় গোলাম মোস্তফার বেশ কিছু কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।১৩২৩ সালের দ্বিতীয় ভাগে প্রকাশিত কবিতাগুলোর মধ্যে ছিল ‘আজান’, এসগ্রাম’, ‘করুণা-নির্ভর, নারীর প্রতি, বর্ষ-বিদায় ও মিছে চাওয়া।১৩২৪ সালের তৃতীয় ভাগে প্রকাশিত হয় ‘ঈদের চাঁদ’, ‘নববর্ষে’, ‘পল্লীবালা’ ও ‘পিতা-পুত্র’।১৩২৫ সালের চতুর্থ ভাগে প্রকাশিত হয় ‘অপ্রকাশ’, ‘রাবেয়ার প্রার্থনা’, ‘ছোট’র আহ্বান’, ‘পল্লী-বালিকার কলিকাতা বিরাগ’ ও ‘বঙ্গনারী’।১৩২৬ সালের পঞ্চম ভাগে প্রকাশিত হয় ‘অভাগী’, ‘দয়াময়’, ‘বাল্যস্মৃতি’ ও ‘মায়াবী’।এ ছাড়া ‘আল-এসলাম’-এর তৃতীয় ভাগে তাঁর দুটি প্রবন্ধ‘ এসলাম জগৎ’ ও ‘এসলামের স্বরূপ’ প্রকাশিত হয়েছিল।এর মধ্যে ‘পল্লী-বালিকার কলিকাতা বিরাগ’ কবিতাটি পরে তাঁর ‘বুলবুলিস্তান’ গ্রন্থে স্থান পায়।বিশ্বনবী উপহার দিয়েছিলেন শহীদুল্লাহকেগোলাম মোস্তফার ‘বিশ্বনবী’ প্রকাশের সময় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের বিবাহ উপলক্ষে চুঁচুড়ায় গিয়েছিলেন। তখন গোলাম মোস্তফা হুগলী কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক।ড. শহীদুল্লাহর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, গোলাম মোস্তফা তাঁকে বইটি উপহার দিয়ে বলেছিলেন, এই সর্বপ্রথম আপনাকে বইখানি উপহার দিলাম।বইটির সঙ্গে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি প্রশংসাপত্রও সংযুক্ত করেছিলেন গোলাম মোস্তফা।ইসলামী সাহিত্যে অবদানড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করতেন, বাংলা ভাষায় অনেক মুসলমান লেখক ও কবি থাকলেও ইসলামী সাহিত্য রচনায় গোলাম মোস্তফার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।তাঁর শেষদিকের সাহিত্যিক অবদানের মধ্যে ছিল বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের আদেশে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর জীবনী রচনা।গোলাম মোস্তফার লেখা না’তে রাসুলও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বিভিন্ন সভায় শুনেছিলেন। এর মধ্যে ছিললা-ইলাহ ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদ রসুল এই কলেমা পড়রে আমার পরাণ বুলবুল...আরেকটি কবিতার পঙ্ক্তি ছিলতুমি যে নূরের রবি নিখিলের ধ্যানের ছবি তুমি না এলে দুনিয়ায় আঁধারে ডুবিত সবি...এসব কবিতা শুনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ গোলাম মোস্তফার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ রাহমানুর রাহিম তাঁর নবীভক্ত ও ইসলামসেবী কবি গোলাম মোস্তফার রূহের মাগফিরাত করে তাঁকে জান্নাতে উচ্চস্থান দেবেন।জানাজায় ইমামতি করেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতিচারণে গোলাম মোস্তফার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে।তিনি লিখেছিলেন, গোলাম মোস্তফা সাহেব আমার ছোট ভাইয়ের ন্যায় ছিলেন।সেই সম্পর্কের শেষ অধ্যায়টি ছিল আরও আবেগপূর্ণ। কবি গোলাম মোস্তফার মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় ইমামতি করেছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তাঁর দাফনেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।সাহিত্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি দুই মনীষীর এই ব্যক্তিগত সম্পর্ক বাংলা সাহিত্য ও মুসলিম সাহিত্যচর্চার ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে। লেখক পরিচিতি: মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ