Ctn Tv

আর্কাইভ

১৫৫ বছরের চন্দনপুরা মসজিদে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর নান্দনিকতার অনন্য ঠিকানা

চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকার সিরাজ-উদ-দৌলা সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা চন্দনপুরা মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি নগরীর ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যেরও অন্যতম প্রতীক। রঙিন অলংকরণ, লতাপাতার নকশা, মোগল ধাঁচের গম্বুজ ও সূক্ষ্ম কারুকাজে নির্মিত মসজিদটি দূর থেকেই নজর কাড়ে। অনেকের কাছে এটি ‘চন্দনপুরা বড় মসজিদ’ বা ‘তাজ মসজিদ’ নামেও পরিচিত।মসজিদটির যাত্রা শুরু ১৮৭০ সালে। সে সময় আব্দুল হামিদ মাস্টার মাটি, চুন-সুরকির দেয়াল এবং টিনের ছাদ দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। শুরু থেকেই দেয়ালের অলংকরণ ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।পরে ১৯৪৬ সালে আব্দুল হামিদ মাস্টারের বংশধর ও ব্রিটিশ সরকারের ঠিকাদার আবু সৈয়দ দোভাষ মসজিদটির পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। নির্মাণকাজে ভারতের কলকাতা থেকে দক্ষ কারিগর এবং দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ আনা হয়। প্রায় ১৩ শতক জমির ওপর নির্মিত দোতলা এ মসজিদে সে সময় পাঁচ লাখ টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছিল, যা ওই সময়ের হিসেবে ছিল উল্লেখযোগ্য।মসজিদের দেয়াল নির্মাণে বিশেষ ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দেয়ালের ফাঁক দিয়ে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস প্রবেশ করায় ভেতরের পরিবেশ সব সময় শীতল ও আলোকিত থাকে।একই নকশায় আবু সৈয়দ দোভাষ নগরের কোতোয়ালী মোড় এলাকায় তাঁর শ্বশুরবাড়িতেও আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। তবে সেটি আকারে চন্দনপুরা মসজিদের তুলনায় ছোট।বর্তমানে ১৫৫ বছর বয়সী এই মসজিদে রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫টি গম্বুজ। প্রতিটি গম্বুজে ওঠার জন্য আলাদা সিঁড়ি রয়েছে। গম্বুজ ও সিঁড়ির নকশায় মোগল স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট। গম্বুজের চারপাশে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির নাম অলংকৃত করা হয়েছে। মাইকের প্রচলনের আগে প্রায় চারতলা সমান উচ্চতার দুটি মিনার থেকে আজান দেওয়া হতো। সেই মিনার দুটি এখনো সংরক্ষিত রয়েছে।১৯৫০ সালে পুনর্নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর থেকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর মসজিদে নতুন করে রঙ করা হয়। পুরো কাজ শেষ করতে সময় লাগে প্রায় তিন থেকে চার মাস। একসময় মসজিদের প্রধান গম্বুজটি প্রায় ১৩ মণ রুপা ও পিতলের সমন্বয়ে নির্মিত ছিল। তবে সময়ের ক্ষয়, বৈরী আবহাওয়া এবং দক্ষ কারিগরের অভাবে সংস্কারের সময় এর অনেক ঐতিহ্যবাহী অংশ হারিয়ে গেছে।চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রকাশনায় এই মসজিদের ছবি ব্যবহার করা হয়। সেই সুবাদে বিদেশি পর্যটকদেরও আগমন ঘটে এখানে।বর্তমানে প্রতিদিনই নতুন নতুন দর্শনার্থী ও মুসল্লিদের পদচারণায় মুখর থাকে চন্দনপুরা মসজিদ। আশপাশে নতুন মসজিদ নির্মিত হলেও এর জনপ্রিয়তা কমেনি। প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেন। শুক্রবারে সেই সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। জায়গা সংকুলান না হলে সড়কের একাংশে জামাতের ব্যবস্থা করা হয়।চন্দনপুরা মসজিদ আজ শুধু একটি উপাসনালয় নয়; এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, স্থাপত্য ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মো: রাকিবুল ইসলামফিচার লেখক

১৫৫ বছরের চন্দনপুরা মসজিদে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর নান্দনিকতার অনন্য ঠিকানা