আমি শোষকের পক্ষে, নাকি শোষিতের পক্ষে-নিজেকেই প্রশ্ন করতে হয়
কবিতা
শুধু সৌন্দর্যচর্চা নয়, মানুষের মানবিক
মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা এবং সত্যকে
সমাজে প্রতিষ্ঠারও একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
কবিতা হতাশ মানুষকে ভরসা
দেয়, মানুষের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করে এবং
নিজের ভেতরটাকে চিনতে সাহায্য করে। কবিতার ভূমিকা
সম্পর্কে এমনটাই মনে করতেন প্রয়াত
কবি আসাদ চৌধুরী।২০২৩
সালের ৫ অক্টোবর কানাডার
টরন্টোতে মারা যান কবি
আসাদ চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুর প্রায়
১০ বছর আগে ২০১৩
সালে এই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন
রোকন রাইয়ান ও আব্দুল্লাহ সিদ্দিক।
সম্প্রতি প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশে কবিতা, দর্শন,
আধুনিকতা, সাহিত্য ও সমাজ নিয়ে
নিজের ভাবনা তুলে ধরেন এই
কবি।কবিতা
সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়মানুষের
সঙ্গে কবিতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আসাদ
চৌধুরী বলেন, কবিতার মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে। একজন কবি
নিজের অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও পারিপার্শ্বিকতা সুন্দরভাবে
তুলে ধরতে পারলে পাঠক
সেখান থেকে নতুন কিছু
জানতে ও শিখতে পারেন।
সৌন্দর্যের অনুসন্ধানও সমাজকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে।পৃথিবীর
বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি
বলেন, মানুষ অসংখ্য স্বপ্ন দেখলেও এখনো চরিত্রহীন, দুর্বৃত্ত
ও নিষ্ঠুর ক্ষমতালোভীদের বাদ দিয়ে একটি
সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে পারেনি।
সুকান্ত ভট্টাচার্য পৃথিবীর সব জঞ্জাল পেরিয়ে
যাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ
করেছিলেন, সেই জঞ্জাল বরং
ক্রমে পাহাড়সমান হয়েছে।কবিতার
প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আসাদ
চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ টানেন। তাঁর মতে, যুদ্ধের
জন্য সৈনিক প্রয়োজন হলেও সৈনিককে প্রেরণা
দেওয়ার জন্যও কিছু প্রয়োজন। কবিতা
সেই প্রেরণা জোগায়। কবিতা সত্যের পক্ষে দাঁড়ায় এবং সমাজে সত্য
প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক প্রভাব
ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সেই প্রচেষ্টায় বাধা
সৃষ্টি করলেও কবিতা মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।তাঁর
ভাষায়, কবিতা হতাশ মানুষকে ভরসা
দেয়, বন্ধুর কাঁধে হাত রাখতে সাহায্য
করে, কখনো সহানুভূতি জানায়,
আবার কখনো অনুপ্রাণিত করে।নিজেকে
চিনতেও কবিতা সাহায্য করেমানুষ
নিজের ভেতরটাকে আবিষ্কার করতে চায়। কবিতা
সেই অনুসন্ধানে সহায়তা করে বলে মনে
করতেন আসাদ চৌধুরী। কবিতার
মধ্য দিয়ে মানুষ যেমন
নিজেকে প্রকাশ করে, তেমনি কবির
লেখার মধ্য দিয়ে পাঠকও
নিজের অনুভূতি ও সত্তাকে চিনতে
পারেন।এ
প্রসঙ্গে ‘শিহরিলো দেবদারু বন’ পঙ্ক্তির উদাহরণ
দেন তিনি। তাঁর ব্যাখ্যায়, এখানে
প্রকৃতপক্ষে দেবদারু বন কাঁপে না,
কাঁপে মানুষের মন। কিন্তু পাঠকের
মনে হয়, যেন প্রকৃতিই
কেঁপে উঠেছে। এভাবেই কবিতা মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক তৈরি করে এবং
আত্ম-অনুসন্ধানের পথ খুলে দেয়।সাহিত্য
মানুষের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়দর্শন
ও সাহিত্যের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে
গিয়ে আসাদ চৌধুরী বলেন,
সাহিত্য মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে পারে।
চার্লি চ্যাপলিন হাস্যরসের মধ্য দিয়েও গভীর
সত্য তুলে ধরেছেন। একইভাবে
নাটক ও উপন্যাস মানুষের
সামনে এমন বাস্তবতা হাজির
করে, যা তাকে নিজের
আচরণ ও বিবেক নিয়ে
ভাবতে বাধ্য করে।তাঁর
মতে, মানুষের দর্শন তার পারিপার্শ্বিকতার ওপর
নির্ভর করে। কৃষিসভ্যতার সঙ্গে
যুক্ত মানুষের চিন্তা আর নগরসভ্যতার মানুষের
চিন্তা এক নয়। সুফিবাদ,
বৈষ্ণববাদসহ বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ধারা মানুষের চিন্তা
ও সৌন্দর্যবোধকে আলোকিত করে।তবে
মানুষ সত্যের কতটা কাছে পৌঁছাতে
পেরেছে, তা নিয়ে সংশয়
প্রকাশ করেন তিনি। আল
মাহমুদের ‘কত দূর এগুলো
মানুষ’ পঙ্ক্তির প্রসঙ্গ তুলে আসাদ চৌধুরী
বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতে পারে—মানুষ
কত দূর পিছিয়েছে।শোষক
ও শোষিতের অবস্থান নিয়েও আত্মজিজ্ঞাসার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
তাঁর মতে, এখন নিজেকেই
প্রশ্ন করতে হয়—আমি
শোষকের পক্ষে, নাকি শোষিতের পক্ষে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিবেকের পাশাপাশি শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।পাশ্চাত্য
শিক্ষায় অভ্যস্ত হয়েও দেশীয় সংস্কৃতির
মধ্যে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা
তুলে ধরে তিনি বলেন,
এই দুইয়ের সমন্বয় আমরা কতটা করতে
পারছি, তা ভেবে দেখা
প্রয়োজন।উত্তরাধুনিক
কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে সংশয়উত্তরাধুনিক
কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন করা
হলে আসাদ চৌধুরী বলেন,
উত্তরাধুনিকতা সম্পর্কে এখনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা
পাওয়া যায়নি বলে তাঁর মনে
হয়।তাঁর
মতে, পাশ্চাত্য শিক্ষায় প্রভাবিত একটি সময়কে আধুনিক
যুগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখন আধুনিকতার পরবর্তী
সময়কে কেউ উত্তরাধুনিক যুগ
বলছেন। বিশ্বায়নের যুগকে দার্শনিকভাবে ব্যাখ্যা করতে কেউ উত্তরাধুনিক
শব্দটি ব্যবহার করলে তাঁর আপত্তি
নেই। তবে সাহিত্যে স্থানীয়
সংস্কৃতি নিয়ে আসা কিংবা
কবিতায় গল্প ও উপদেশের
উপস্থিতি নিয়ে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ
আরোপকে তিনি উত্তরাধুনিকতার চূড়ান্ত
সংজ্ঞা হিসেবে মানতে চাননি।কবিরা
বাঁধাধরা নিয়ম মানতে পারেন
না উল্লেখ করে তিনি বলেন,
যেখানে বাধা আসে, সেখানেই
কবিরা প্রতিবাদ করেন। কবিতার কোনো একটি নির্দিষ্ট
ফর্মুলা চূড়ান্ত হতে পারে না।সমকালীন
কবিতা নিয়েও নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন আসাদ
চৌধুরী। তাঁর মতে, এখনকার
তরুণেরা অনেক ভালো কবিতা
লিখছেন। কিন্তু পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের
সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পরও
ভালো লেখা শনাক্ত করা
কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক
ভালো লেখা পাঠকের নজরে
আসছে না।ঐতিহ্য
ও আধুনিকতার সম্পর্কবাংলা
কবিতায় আধুনিকতার বিকাশ প্রসঙ্গে আসাদ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর ও মাইকেল মধুসূদন
দত্তের কথা উল্লেখ করেন।
পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র,
জীবনানন্দ দাশ ও অমিয়
চক্রবর্তীর মতো কবিদের আলোচনায়
আনেন।তাঁর
মতে, বাংলা কবিতার আধুনিকতার আলোচনায় ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করার প্রবণতা ছিল।
মধ্যযুগের সাহিত্য সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর মূল্যায়নের প্রসঙ্গ
টেনে তিনি বলেন, ঐতিহ্যকে
অস্বীকার করে আধুনিকতার পূর্ণাঙ্গ
পরিচয় পাওয়া কঠিন।মধুসূদন
দত্ত খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেও রাম, রাধা
ও দেবমন্দিরের বিষয় নিয়ে লিখেছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম গ্রিক পুরাণ ব্যবহার করেছেন এবং ইসলামি চিন্তাকে
নতুনভাবে কবিতায় তুলে ধরেছেন। এসব
উদাহরণ দিয়ে আসাদ চৌধুরী
দেখাতে চেয়েছেন, বাংলা কবিতার শক্তি বিভিন্ন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সৃজনশীল
ব্যবহারের মধ্যেও নিহিত।ফিলিস্তিনি
কবিতা ও অনুবাদের প্রসঙ্গফিলিস্তিনি
কবিতা অনুবাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আসাদ
চৌধুরী বলেন, আরবি ভাষার কবিতা
অত্যন্ত শক্তিশালী। ফিলিস্তিনি কবি ফাদওয়া তুকানের
কবিতার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি ইসরায়েলের একজন
সামরিক কর্মকর্তার মূল্যায়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী,
তুকানের একটি কবিতাকে দশজন
কমান্ডোর শক্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল।মধ্যপ্রাচ্যের
রাজনৈতিক সংকট, তেলসম্পদ ঘিরে পশ্চিমা বিশ্বের
আগ্রহ এবং লেবাননের বৈরুতের
সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়েও কথা বলেন তিনি।
একসময় বৈরুতকে ‘প্রাচ্যের প্যারিস’ বলা হতো। বিভিন্ন
মতাদর্শের মানুষ ও নানা দেশ
থেকে বিতাড়িত ব্যক্তিরা সেখানে সমবেত হতেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির
কারণে অনেক কবি আবার
দেশ ছেড়ে অন্য অঞ্চলে
চলে যান।কাহলিল
জিবরান, আদোনিসসহ আরব সাহিত্যজগতের কবিদের
প্রসঙ্গও তোলেন আসাদ চৌধুরী। তিনি
জানান, আরব দেশের প্রতিবাদী
কবিতা নিয়ে তাঁর অনুবাদের
কাজ ছিল ইংরেজি থেকে;
সরাসরি আরবি থেকে নয়।বাংলা
ভাষায় বিভিন্ন দেশের কবিতার অনুবাদ প্রসঙ্গে তিনি উর্দু, জার্মান
ও জাপানি ভাষায় অনূদিত কবিতার কথাও উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, বাংলা
সাহিত্যের পাঠকদের জন্য বিভিন্ন ভাষা
ও সংস্কৃতির কবিতা অনুবাদের গুরুত্ব রয়েছে।
কবিতা,
দর্শন, মানবিকতা ও সমাজ নিয়ে
আসাদ চৌধুরীর এসব ভাবনা তাঁর
সাহিত্যদৃষ্টির বিস্তৃতি তুলে ধরে। তাঁর
কাছে কবিতা ছিল শুধু ভাষার
সৌন্দর্য নয়; বরং সত্য
অনুসন্ধান, আত্মজিজ্ঞাসা এবং মানুষের পাশে
দাঁড়ানোর এক সৃজনশীল মাধ্যম।