সৈয়দ নওয়াব
আলী চৌধুরী ১৮৬৩ সালের ২৯
ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর এক প্রভাবশালী জমিদার
পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রপিতামহ শাহ
সৈয়দ খোদা বক্স বাগদাদ
থেকে এসে ধর্মপ্রচারে যুক্ত
হয়েছিলেন। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরুর পর তিনি কলকাতার
সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
১৯০৫ সালের
বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে নওয়াব আলী
চৌধুরীর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।
তিনি মনে করতেন, মুসলমানদের
রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক
প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন।
১৯০৬ সালে
ঢাকার শাহবাগে নওয়াব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ
প্রতিষ্ঠার সময় তিনি অন্যতম
উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেন। একই
বছর ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে
সাক্ষাৎ করা ৩৫ সদস্যের
শিমলা প্রতিনিধি দলেও তিনি পূর্ব
বাংলার মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করেন।
পরবর্তী সময়ে
তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান মন্ত্রী হিসেবে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২৫
সালে গভর্নর কাউন্সিলের সদস্যও হন।
১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর
পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শিক্ষাক্ষেত্রে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।
নওয়াব আলী চৌধুরী এ
দাবির অন্যতম সক্রিয় সমর্থক ছিলেন।
ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ও
নওয়াব সলিমুল্লাহ ব্রিটিশ সরকারের ওপর ধারাবাহিকভাবে চাপ
সৃষ্টি করেন। ১৯১৭ সালে ইম্পেরিয়াল
লেজিসলেটিভ কাউন্সিলেও নওয়াব আলী চৌধুরী বিষয়টি
জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার
সময় অর্থসংকট দেখা দিলে তিনি
নিজের জমিদারির একটি অংশ বন্ধক
রেখে ৩৫ হাজার টাকা
দেন বলে উল্লেখ করা
হয়। পরে শিক্ষার্থীদের বৃত্তির
জন্য আরও ১৬ হাজার
টাকা দেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। ১৯২০ সালে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাসের ক্ষেত্রেও
তাঁর প্রচেষ্টাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
শিক্ষার পাশাপাশি
বাংলা ভাষার প্রসারেও নওয়াব আলী চৌধুরী সক্রিয়
ছিলেন। ১৯২১ সালে বঙ্গীয়
প্রাদেশিক আইন পরিষদে বাংলাকে
প্রদেশের সরকারি ভাষা করার জন্য
তিনি লিখিত প্রস্তাব দেন।
সাংবাদিকতা ও
সাহিত্যচর্চার পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন তিনি। ‘মিহির’ ও ‘সুধাকর’ পত্রিকা
একীভূত করে ‘সাপ্তাহিক মিহির-সুধাকর’ প্রকাশ করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ
তৎকালীন বিদ্বানদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার কথাও তাঁর জীবনীতে
উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর লেখা
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Vernacular Education
in Bengal’ (১৯০০) এবং ‘Primary Education in
Rural Areas (১৯০৬)।
নওয়াব আলী
চৌধুরীর সমাজসেবার একটি বড় ক্ষেত্র
ছিল শিক্ষা। ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের
প্রায় ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায়
তিনি জমি ও অর্থ
দিয়ে সহযোগিতা করেন। ১৯১০ সালে ধনবাড়ীতে
প্রতিষ্ঠা করেন ‘নওয়াব ইনস্টিটিউট’।
মুসলমান শিক্ষার্থীদের
আবাসনসংকট কমাতে কলকাতা, ঢাকা ও ময়মনসিংহে
ছাত্রাবাস নির্মাণেও তিনি উল্লেখযোগ্য অর্থ
সহায়তা করেন।
শিক্ষা, রাজনীতি
ও সমাজসেবায় দীর্ঘ কর্মজীবনের পর ১৯২৯ সালের
১৭ এপ্রিল দার্জিলিংয়ে মৃত্যুবরণ করেন সৈয়দ নওয়াব
আলী চৌধুরী।
তাঁর পরিবারের
রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও পরবর্তী সময়ে আলোচনায় আসে।
তাঁর পৌত্র মোহাম্মদ আলী বগুড়া পাকিস্তানের
তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম দীর্ঘদিন
ধরে যুক্ত। তাঁর অবদান স্মরণে
বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সৈয়দ নওয়াব আলী
চৌধুরী সিনেট ভবন’ নামটিও গুরুত্বপূর্ণ
হয়ে আছে।
লেখক:
মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম
সাধারণ সম্পাদক: বাংলাদেশ
ইতিহাস চর্চা পরিষদ

রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সৈয়দ নওয়াব
আলী চৌধুরী ১৮৬৩ সালের ২৯
ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর এক প্রভাবশালী জমিদার
পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রপিতামহ শাহ
সৈয়দ খোদা বক্স বাগদাদ
থেকে এসে ধর্মপ্রচারে যুক্ত
হয়েছিলেন। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরুর পর তিনি কলকাতার
সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
১৯০৫ সালের
বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে নওয়াব আলী
চৌধুরীর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।
তিনি মনে করতেন, মুসলমানদের
রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক
প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন।
১৯০৬ সালে
ঢাকার শাহবাগে নওয়াব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ
প্রতিষ্ঠার সময় তিনি অন্যতম
উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেন। একই
বছর ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে
সাক্ষাৎ করা ৩৫ সদস্যের
শিমলা প্রতিনিধি দলেও তিনি পূর্ব
বাংলার মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করেন।
পরবর্তী সময়ে
তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান মন্ত্রী হিসেবে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২৫
সালে গভর্নর কাউন্সিলের সদস্যও হন।
১৯১১ সালে
বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর
পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শিক্ষাক্ষেত্রে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।
নওয়াব আলী চৌধুরী এ
দাবির অন্যতম সক্রিয় সমর্থক ছিলেন।
ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ও
নওয়াব সলিমুল্লাহ ব্রিটিশ সরকারের ওপর ধারাবাহিকভাবে চাপ
সৃষ্টি করেন। ১৯১৭ সালে ইম্পেরিয়াল
লেজিসলেটিভ কাউন্সিলেও নওয়াব আলী চৌধুরী বিষয়টি
জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার
সময় অর্থসংকট দেখা দিলে তিনি
নিজের জমিদারির একটি অংশ বন্ধক
রেখে ৩৫ হাজার টাকা
দেন বলে উল্লেখ করা
হয়। পরে শিক্ষার্থীদের বৃত্তির
জন্য আরও ১৬ হাজার
টাকা দেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। ১৯২০ সালে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাসের ক্ষেত্রেও
তাঁর প্রচেষ্টাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
শিক্ষার পাশাপাশি
বাংলা ভাষার প্রসারেও নওয়াব আলী চৌধুরী সক্রিয়
ছিলেন। ১৯২১ সালে বঙ্গীয়
প্রাদেশিক আইন পরিষদে বাংলাকে
প্রদেশের সরকারি ভাষা করার জন্য
তিনি লিখিত প্রস্তাব দেন।
সাংবাদিকতা ও
সাহিত্যচর্চার পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন তিনি। ‘মিহির’ ও ‘সুধাকর’ পত্রিকা
একীভূত করে ‘সাপ্তাহিক মিহির-সুধাকর’ প্রকাশ করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ
তৎকালীন বিদ্বানদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার কথাও তাঁর জীবনীতে
উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর লেখা
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Vernacular Education
in Bengal’ (১৯০০) এবং ‘Primary Education in
Rural Areas (১৯০৬)।
নওয়াব আলী
চৌধুরীর সমাজসেবার একটি বড় ক্ষেত্র
ছিল শিক্ষা। ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের
প্রায় ৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায়
তিনি জমি ও অর্থ
দিয়ে সহযোগিতা করেন। ১৯১০ সালে ধনবাড়ীতে
প্রতিষ্ঠা করেন ‘নওয়াব ইনস্টিটিউট’।
মুসলমান শিক্ষার্থীদের
আবাসনসংকট কমাতে কলকাতা, ঢাকা ও ময়মনসিংহে
ছাত্রাবাস নির্মাণেও তিনি উল্লেখযোগ্য অর্থ
সহায়তা করেন।
শিক্ষা, রাজনীতি
ও সমাজসেবায় দীর্ঘ কর্মজীবনের পর ১৯২৯ সালের
১৭ এপ্রিল দার্জিলিংয়ে মৃত্যুবরণ করেন সৈয়দ নওয়াব
আলী চৌধুরী।
তাঁর পরিবারের
রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও পরবর্তী সময়ে আলোচনায় আসে।
তাঁর পৌত্র মোহাম্মদ আলী বগুড়া পাকিস্তানের
তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম দীর্ঘদিন
ধরে যুক্ত। তাঁর অবদান স্মরণে
বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সৈয়দ নওয়াব আলী
চৌধুরী সিনেট ভবন’ নামটিও গুরুত্বপূর্ণ
হয়ে আছে।
লেখক:
মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম
সাধারণ সম্পাদক: বাংলাদেশ
ইতিহাস চর্চা পরিষদ

আপনার মতামত লিখুন