মিরসরাই
অর্থনৈতিক অঞ্চলে এখনো নেই কোনো
পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। নেই বিশেষায়িত ট্রমা
বা বার্ন চিকিৎসাকেন্দ্রও। ফলে বড় কোনো
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত বা দগ্ধ
শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয়
প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরের
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে।
সাম্প্রতিক
একটি দুর্ঘটনা আবারও এই সংকট সামনে
এনেছে।
গত
২৮ সেপ্টেম্বর ‘ফার্মিক স্টিল লিমিটেড’ কারখানায় ফার্নেসের ত্রুটির কারণে ফুটন্ত গলিত লোহা ছিটকে
চারজন দগ্ধ হন। তাঁদের
মধ্যে ছিলেন একজন চীনা প্রকৌশলী।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসাধীন
অবস্থায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত
ব্যক্তিরা হলেন চীনা প্রকৌশলী
জেংলিং হং (৫৩), শ্রমিক
শরিফুল ইসলাম (২৭) ও মনির
হোসেন (২৭)। দগ্ধ
শ্রমিক জুয়েল (৩৬) বর্তমানে চট্টগ্রাম
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন
ইউনিটে চিকিৎসাধীন।
কারখানা
সূত্র ও পুলিশ জানায়,
ঢাকার জাতীয় দগ্ধ ও প্লাস্টিক
সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ অক্টোবর সকাল
সাড়ে ১১টায় শরিফুল ইসলাম এবং ২ অক্টোবর
সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে
জেংলিং হং মারা যান।
এর আগে ১ অক্টোবর
রাত সাড়ে ৯টায় চমেক
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মনির
হোসেন।
এই
দুর্ঘটনার পর শিল্পাঞ্চলের জরুরি
চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে
প্রশ্ন উঠেছে। উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে,
ঘটনাটি শুধু একটি কারখানার
নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয় নয়; এর
মধ্য দিয়ে প্রায় ২৫
হাজার শ্রমিক-কর্মচারী এবং আশপাশের ছয়টি
ইউনিয়নের মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে।
মিরসরাই
অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে উপজেলা সদরের
হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এরপর
চমেক হাসপাতাল আরও প্রায় ৬০
কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ দুর্ঘটনাস্থল থেকে চট্টগ্রাম শহরের
হাসপাতালে যেতে প্রায় ৮৫
কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে
হয়। যানজট ও সড়কের পরিস্থিতির
ওপর নির্ভর করে এই যাত্রা
আরও দীর্ঘ হতে পারে।
চট্টগ্রাম
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ
চিকিৎসক ডা. প্রদীপ বলেন,
শিল্পকারখানায় দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা, ট্রমা ও বার্ন সেবা
দেওয়া গেলে অনেক জীবন
রক্ষা করা সম্ভব। গুরুতর
আহত রোগীকে শহরে আনতে দীর্ঘ
সময় লেগে গেলে পথেই
তাঁর জীবন ঝুঁকির মুখে
পড়ে। তাঁর মতে, দুর্ঘটনার
পর চিকিৎসা শুরু করতে যত
কম সময় লাগে, রোগীর
বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও তত বাড়ে।
শিল্প
পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রায়সুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটির আয়তন বড় এবং
নতুন নতুন কারখানা গড়ে
উঠছে। এর সঙ্গে বাড়ছে
মানুষের সংখ্যা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
তাই এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল
এখন সময়ের দাবি।
পিএইচপি
গ্রুপের কনসালট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার খায়রুল মোস্তফা বলেন, শিল্পাঞ্চলের পরিধি বিবেচনায় হাসপাতালের পাশাপাশি ফার্স্ট এইড রুম, পর্যাপ্ত
অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়মিত মহড়ার
ব্যবস্থা থাকা দরকার। শিল্পাঞ্চলের
সড়কে ট্রাফিক সংকেত, ভারী যানবাহনের গতি
নিয়ন্ত্রণ, সড়কবাতি ও সিসিটিভিও বাড়ানোর
প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ
প্রাইভেট ইকোনমিক জোনস অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা
ও বেজার সাবেক পরামর্শক মো. আবদুল কাদের
খান বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে দ্রুত বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ছে।
কিন্তু জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে
পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
আধুনিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাফল্য শুধু বিনিয়োগ ও
উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে
না; সেখানে কর্মরত মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগকারীদের
পক্ষে নাসির উদ্দিন বলেন, এক দশক পার
হলেও এখানে চিকিৎসার ন্যূনতম সুবিধা গড়ে ওঠেনি। উন্নত
চিকিৎসার জন্য প্রায় ৮৫
কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রাম শহরে যেতে হয়।
গুরুতর আহত রোগীর ক্ষেত্রে
এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে
গিয়ে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে
ওঠে।
তবে
হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ একেবারে নেই, এমন নয়।
বেজার পরিচালক (উন্নয়ন) সালেহ আহমদ জানান, শিল্পাঞ্চলের
ব্লক-১৮ এলাকায় হাসপাতালের
জন্য নির্ধারিত জায়গায় সীমানাপ্রাচীর ও চাইল্ড হেলথ
কেয়ার ভবন নির্মিত হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের জন্যও জমি রাখা হয়েছে।
তবে সময় ও প্রয়োজনীয়
সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে এগুলো এখনো চালু করা
সম্ভব হয়নি।
১৫
লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে চলা
এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বর্তমানে ১৭টি বড় কারখানা
উৎপাদনে রয়েছে। সামনে আরও ২৪টি কারখানা
চালু হওয়ার পথে। শিল্পের পরিধি
যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে শ্রমিক
ও আশপাশের মানুষের সংখ্যা।
নিহত শ্রমিকদের পরিবারের শোক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে তাই শিল্পাঞ্চলের মানুষের দাবি একটাই—শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত গড়ে তোলা হোক পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল, বিশেষায়িত ট্রমা ও বার্ন ইউনিট এবং ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স সেবা।

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬
মিরসরাই
অর্থনৈতিক অঞ্চলে এখনো নেই কোনো
পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। নেই বিশেষায়িত ট্রমা
বা বার্ন চিকিৎসাকেন্দ্রও। ফলে বড় কোনো
দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত বা দগ্ধ
শ্রমিকদের চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয়
প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরের
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে।
সাম্প্রতিক
একটি দুর্ঘটনা আবারও এই সংকট সামনে
এনেছে।
গত
২৮ সেপ্টেম্বর ‘ফার্মিক স্টিল লিমিটেড’ কারখানায় ফার্নেসের ত্রুটির কারণে ফুটন্ত গলিত লোহা ছিটকে
চারজন দগ্ধ হন। তাঁদের
মধ্যে ছিলেন একজন চীনা প্রকৌশলী।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসাধীন
অবস্থায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত
ব্যক্তিরা হলেন চীনা প্রকৌশলী
জেংলিং হং (৫৩), শ্রমিক
শরিফুল ইসলাম (২৭) ও মনির
হোসেন (২৭)। দগ্ধ
শ্রমিক জুয়েল (৩৬) বর্তমানে চট্টগ্রাম
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন
ইউনিটে চিকিৎসাধীন।
কারখানা
সূত্র ও পুলিশ জানায়,
ঢাকার জাতীয় দগ্ধ ও প্লাস্টিক
সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ অক্টোবর সকাল
সাড়ে ১১টায় শরিফুল ইসলাম এবং ২ অক্টোবর
সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে
জেংলিং হং মারা যান।
এর আগে ১ অক্টোবর
রাত সাড়ে ৯টায় চমেক
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মনির
হোসেন।
এই
দুর্ঘটনার পর শিল্পাঞ্চলের জরুরি
চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে
প্রশ্ন উঠেছে। উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে,
ঘটনাটি শুধু একটি কারখানার
নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয় নয়; এর
মধ্য দিয়ে প্রায় ২৫
হাজার শ্রমিক-কর্মচারী এবং আশপাশের ছয়টি
ইউনিয়নের মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে।
মিরসরাই
অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে উপজেলা সদরের
হাসপাতালের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এরপর
চমেক হাসপাতাল আরও প্রায় ৬০
কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ দুর্ঘটনাস্থল থেকে চট্টগ্রাম শহরের
হাসপাতালে যেতে প্রায় ৮৫
কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে
হয়। যানজট ও সড়কের পরিস্থিতির
ওপর নির্ভর করে এই যাত্রা
আরও দীর্ঘ হতে পারে।
চট্টগ্রাম
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ
চিকিৎসক ডা. প্রদীপ বলেন,
শিল্পকারখানায় দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা, ট্রমা ও বার্ন সেবা
দেওয়া গেলে অনেক জীবন
রক্ষা করা সম্ভব। গুরুতর
আহত রোগীকে শহরে আনতে দীর্ঘ
সময় লেগে গেলে পথেই
তাঁর জীবন ঝুঁকির মুখে
পড়ে। তাঁর মতে, দুর্ঘটনার
পর চিকিৎসা শুরু করতে যত
কম সময় লাগে, রোগীর
বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও তত বাড়ে।
শিল্প
পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রায়সুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটির আয়তন বড় এবং
নতুন নতুন কারখানা গড়ে
উঠছে। এর সঙ্গে বাড়ছে
মানুষের সংখ্যা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
তাই এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল
এখন সময়ের দাবি।
পিএইচপি
গ্রুপের কনসালট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার খায়রুল মোস্তফা বলেন, শিল্পাঞ্চলের পরিধি বিবেচনায় হাসপাতালের পাশাপাশি ফার্স্ট এইড রুম, পর্যাপ্ত
অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়মিত মহড়ার
ব্যবস্থা থাকা দরকার। শিল্পাঞ্চলের
সড়কে ট্রাফিক সংকেত, ভারী যানবাহনের গতি
নিয়ন্ত্রণ, সড়কবাতি ও সিসিটিভিও বাড়ানোর
প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ
প্রাইভেট ইকোনমিক জোনস অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা
ও বেজার সাবেক পরামর্শক মো. আবদুল কাদের
খান বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে দ্রুত বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ছে।
কিন্তু জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে
পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
আধুনিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাফল্য শুধু বিনিয়োগ ও
উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে
না; সেখানে কর্মরত মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগকারীদের
পক্ষে নাসির উদ্দিন বলেন, এক দশক পার
হলেও এখানে চিকিৎসার ন্যূনতম সুবিধা গড়ে ওঠেনি। উন্নত
চিকিৎসার জন্য প্রায় ৮৫
কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রাম শহরে যেতে হয়।
গুরুতর আহত রোগীর ক্ষেত্রে
এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে
গিয়ে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে
ওঠে।
তবে
হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ একেবারে নেই, এমন নয়।
বেজার পরিচালক (উন্নয়ন) সালেহ আহমদ জানান, শিল্পাঞ্চলের
ব্লক-১৮ এলাকায় হাসপাতালের
জন্য নির্ধারিত জায়গায় সীমানাপ্রাচীর ও চাইল্ড হেলথ
কেয়ার ভবন নির্মিত হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের জন্যও জমি রাখা হয়েছে।
তবে সময় ও প্রয়োজনীয়
সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে এগুলো এখনো চালু করা
সম্ভব হয়নি।
১৫
লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগিয়ে চলা
এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বর্তমানে ১৭টি বড় কারখানা
উৎপাদনে রয়েছে। সামনে আরও ২৪টি কারখানা
চালু হওয়ার পথে। শিল্পের পরিধি
যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে শ্রমিক
ও আশপাশের মানুষের সংখ্যা।
নিহত শ্রমিকদের পরিবারের শোক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে তাই শিল্পাঞ্চলের মানুষের দাবি একটাই—শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত গড়ে তোলা হোক পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল, বিশেষায়িত ট্রমা ও বার্ন ইউনিট এবং ২৪ ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স সেবা।

আপনার মতামত লিখুন