অহংকারের পতন, বিনয়ের শিক্ষা এবং কুরাকাটনী মসজিদের ইতিহাস
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী চট্টগ্রামের কুরাকাটনী মসজিদচট্টগ্রামের পটিয়া
উপজেলার দক্ষিণ
হরিণখাইন গ্রামে
দাঁড়িয়ে আছে
প্রায়
দুই
শতাব্দী পুরোনো
ঐতিহাসিক ‘কুরাকাটনী মসজিদ’। স্থানীয়ভাবে এটি
‘লাকসা
জামে
মসজিদ’
নামেও
পরিচিত। ১২২২
হিজরি
মোতাবেক ১৮০৭
খ্রিষ্টাব্দে আব্দুল
ওয়াহাব
মুন্সী
মসজিদটি নির্মাণ করেন।প্রাচীন এই
মসজিদটি শুধু
একটি
ধর্মীয়
স্থাপনা নয় এর
সঙ্গে
জড়িয়ে
আছে
চট্টগ্রামের প্রধান
আধ্যাত্মিক সাধক
হযরত
শাহ
সূফী
আমানত
খান
(র.)-এর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
এতে
রয়েছে
এক
নিরক্ষর কিশোরের জীবনের
পরিবর্তন, সাফল্যের পর
অহংকারে পতন,
আত্মশুদ্ধি এবং
মোর্শেদের নির্দেশে মসজিদ
নির্মাণের কাহিনি।নিরক্ষর
কিশোর থেকে খ্যাতনামা আইনজীবীহযরত শাহ
সূফী
আমানত
খান
(র.)-এর দরবার ও
পরিবারে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে
খেদমত
করতেন
‘খোসামাবুদি’ নামে
এক
বিধবা
নারী।
তাঁর
ছেলে
আব্দুল
ওয়াহাবের কোনো
অক্ষরজ্ঞান ছিল
না।একদিন খোসামাবুদি হযরত
শাহ
আমানত
(র.)-এর কাছে তাঁর
এতিম
ছেলের
জন্য
কোনো
রুজি-রোজগার বা চাকরির
ব্যবস্থা করে
দেওয়ার
অনুরোধ
করেন।
তখন
হযরত
শাহ
আমানত
(র.)
আব্দুল
ওয়াহাবকে ডেকে
‘ওকালতি’
করার
নির্দেশ দেন।আধ্যাত্মিক সাধকের
দোয়া
ও
নির্দেশনার পর
আব্দুল
ওয়াহাবের জীবনে
আসে
পরিবর্তন। সম্পূর্ণ নিরক্ষর সেই
কিশোর
পরবর্তী সময়ে
তৎকালীন চট্টগ্রামের একজন
খ্যাতনামা ও
শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত হন।সাফল্যের
সঙ্গে বাড়তে থাকে অহংকারযশ, খ্যাতি,
প্রতিপত্তি ও
বিত্তের প্রাচুর্য আব্দুল
ওয়াহাবের জীবনকে
বদলে
দেয়।
একসময়
তিনি
নিজের
অতীত
এবং
অসহায়-দরিদ্র মানুষের কথা
ভুলে
যেতে
থাকেন।
বিত্তশালী সমাজের
আভিজাত্য তাঁকে
এমনভাবে প্রভাবিত করে
যে,
তাঁর
মধ্যে
অহংকার
ও
আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরি
হয়।খানকাহ শরীফে
থাকা
হযরত
শাহ
আমানত
(র.)
তাঁর
প্রিয়
শাগরেদের এই
পরিবর্তন উপলব্ধি করেন।
আব্দুল
ওয়াহাবের নৈতিক
স্খলন
তাঁকে
ব্যথিত
করে।এরই মধ্যে
নিজের
সামাজিক অবস্থান ও
প্রতিপত্তি প্রদর্শনের জন্য
আব্দুল
ওয়াহাব
তাঁর
প্রাসাদোপম বাড়িতে
চট্টগ্রামের গণ্যমান্য ও
বিত্তবান ব্যক্তিদের জন্য
একটি
বড়
জিয়াফতের আয়োজন
করেন।
তিনি
খানকাহ
শরীফে
গিয়ে
তাঁর
মোর্শেদকে অনুষ্ঠানের প্রধান
অতিথি
হওয়ার
অনুরোধ
জানান।হযরত শাহ
আমানত
(র.)
প্রথমে
ধনীদের
জন্য
আয়োজিত
এই
জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান এড়িয়ে
যাওয়ার
পরামর্শ দেন।
তিনি
আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের
উদ্দেশ্যে সর্বসাধারণের জন্য
উন্মুক্ত জিয়াফত
করার
কথা
বলেন।আব্দুল ওয়াহাব
তাঁকে
আশ্বস্ত করে
জানান,
ধনী-দরিদ্র সবাই একই
থালায়
এবং
একই
নিয়মে
খাবেন।
তাঁর
বারবার
অনুরোধের পর
শেষ
পর্যন্ত হযরত
শাহ
আমানত
(র.)
দাওয়াত
গ্রহণে
সম্মত
হন।দরবেশের
বেশে মোর্শেদের আগমনজিয়াফতের দিন
আব্দুল
ওয়াহাবের বাড়িতে
রাজকীয়
আয়োজন
করা
হয়।
একটি
সুদৃশ্য মঞ্চ
তৈরি
করা
হয়।
মঞ্চের
চারপাশে নিরাপত্তার জন্য
দারোয়ান নিযুক্ত করা
হয়।
চট্টগ্রামের নামী-দামি অতিথিরা অপেক্ষা করছিলেন হযরত
শাহ
আমানত
(র.)-এর জন্য।এমন সময়
জীর্ণ
পোশাক
পরা
এক
শীর্ণকায় দরবেশ
ভিখারিদের ভিড়
ঠেলে
মঞ্চে
ওঠার
চেষ্টা
করেন।
কিন্তু
তাঁর
পোশাক
ও
চেহারা
দেখে
দারোয়ানরা তাঁকে
বাধা
দেয়
এবং
তাচ্ছিল্যের সঙ্গে
সেখান
থেকে
সরিয়ে
দেয়। দরবেশটি কোনো
প্রতিবাদ না
করে
ভিড়ের
মধ্যে
হারিয়ে
যান।কিছুক্ষণ পর
খবর
ছড়িয়ে
পড়ে,
হযরত
শাহ
আমানত
(র.)-কে প্রধান ফটক
থেকে
অপমানিত হয়ে
ফিরে
যেতে
দেখা
গেছে।
খবরটি
শুনে
আব্দুল
ওয়াহাব
কান্নায় ভেঙে
পড়েন।
তখন
তিনি
বুঝতে
পারেন,
কিছুক্ষণ আগে
যে
জীর্ণবেশী দরবেশকে দারোয়ানরা অপমান
করে
ফিরিয়ে
দিয়েছিল, তিনি
আর
কেউ
নন-
স্বয়ং
তাঁর
মোর্শেদ হযরত
শাহ
আমানত
(র.)।আগুনে পুড়ে যায় প্রাসাদএরপরই ঘটে
এক
অলৌকিক
ঘটনা-
এমনটাই
প্রচলিত বর্ণনায় উল্লেখ
করা
হয়েছে।আব্দুল ওয়াহাবের বহু
সাধের
বিলাসবহুল প্রাসাদে হঠাৎ
আগুন
ধরে
যায়।
মুহূর্তের মধ্যে
আগুনের
লেলিহান শিখায়
পুড়ে
ভস্মীভূত হয়ে
যায়
পুরো
প্রাসাদ। সেই
সঙ্গে
ভেস্তে
যায়
জাঁকজমকপূর্ণ ভোজের
আয়োজনও।পরদিন ভগ্নহৃদয়ে আব্দুল
ওয়াহাব
হযরত
শাহ
আমানত
(র.)-এর খানকাহ শরীফে
হাজির
হন।
তিনি
কান্নায় ভেঙে
পড়ে
ক্ষমা
চান।তখন হযরত শাহ আমানত (র.) তাঁকে বলেন-হায় ওয়াহাব!
আমার
এতটা
বারণ
তুমি
শুনলে
না।
একসঙ্গে ধনী
ও
গরিবকে
এক
কাতারে
বসিয়ে
খাওয়ানোর মতো
মানসিকতা বা
সামর্থ্য তোমার
তৈরি
হয়নি।এরপর আব্দুল
ওয়াহাবের অহংকারের পরিণতি
সম্পর্কে হযরত
শাহ
আমানত
(র.)
বলেন,
আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর
এই
অহংকারের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে
পরবর্তী সাত
পুরুষ
পর্যন্ত প্রতি
প্রজন্মে একজন
করে
পুরুষ
সদস্য
মানসিক
ভারসাম্যহীন হয়ে
জন্ম
নেবে।একই সঙ্গে
তিনি
আব্দুল
ওয়াহাবকে আত্মশুদ্ধি এবং
আল্লাহর ঘরের
খেদমতের উদ্দেশ্যে তাঁর
নিজ
গ্রামে
একটি
মসজিদ
নির্মাণের নির্দেশ দেন।মোর্শেদের
নির্দেশে নির্মিত হয় কুরাকাটনী মসজিদমোর্শেদের এই
নির্দেশ আব্দুল
ওয়াহাব
মুন্সীর জীবনে
বড়
পরিবর্তন আনে।
তিনি
ধর্মের
পথে
ফিরে
আসেন
এবং
হযরত
শাহ
আমানত
(র.)-এর নির্দেশ পালন
করেন।নিজ গ্রাম
পটিয়ার
দক্ষিণ
হরিণখাইনে ১৮০৭
খ্রিষ্টাব্দে তিনি
নির্মাণ করেন
একটি
মসজিদ।
সময়ের
সঙ্গে
সেই
মসজিদই
‘কুরাকাটনী মসজিদ’
নামে
পরিচিত
হয়ে
ওঠে।
স্থানীয়ভাবে এটি
‘লাকসা
জামে
মসজিদ’
নামেও
পরিচিত। প্রায় দুই
শতাব্দী ধরে
মসজিদটি চট্টগ্রামের ইতিহাস
ও
ঐতিহ্যের সাক্ষী
হয়ে
দাঁড়িয়ে আছে।সাত পুরুষের
কাহিনিপ্রচলিত এই
ইতিহাসের বর্ণনা
অনুযায়ী, হযরত
শাহ
আমানত
(র.)-এর সেই বাণী
পরবর্তী সময়ে
সত্য
প্রমাণিত হয়।
আব্দুল
ওয়াহাবের বংশের
প্রতিটি প্রজন্মে একজন
করে
পুরুষ
সদস্য
মানসিক
ভারসাম্যহীনতা নিয়ে
জীবন
কাটিয়েছেন বলে
দাবি
করা
হয়।কিছুদিন আগে
এই
বংশের
সপ্তম
পুরুষ
‘মোহাম্মদ’ মানসিক
ভারসাম্যহীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
এর
মধ্য
দিয়ে
হযরত
শাহ
আমানত
(র.)-এর ঘোষিত সাত
পুরুষের সেই
প্রায়শ্চিত্তের মেয়াদ
পূর্ণ
হয়েছে
বলে
বংশের
লোকজন
মনে
করেন।
তাঁদের
দাবি,
বর্তমানে এই
বংশে
আর
কোনো
মানসিক
ভারসাম্যহীন ব্যক্তি নেই।চট্টগ্রামের ইতিহাস
ও
ঐতিহ্যের সঙ্গে
জড়িয়ে
থাকা
কুরাকাটনী মসজিদ
তাই
শুধু
একটি
প্রাচীন স্থাপনা নয়।
এটি
স্থানীয় মানুষের কাছে
আধ্যাত্মিক শিক্ষা,
অহংকারের পরিণতি,
আত্মশুদ্ধি এবং
এক
ঐতিহাসিক বংশকাহিনির স্মারক।সূত্র: ‘হযরত শাহ সূফী আমানত খান (র.)’ গ্রন্থে শাহজাদা আমান উদ্দিন আব্দুল্লাহর লেখা থেকে সংগৃহীত।লেখক পরিচিতি:
মোহাম্মদ নাজমুল হক শামীম
সম্পাদক, লিটল ম্যাগাজিন ‘চট্টলানামা’
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস চর্চা পরিষদ