অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না টুপটুপ রিসোর্টের, প্রাণ গেল ১০ জনের
কক্সবাজারের
উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এক শিশুসহ ১০
পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। দুর্গাপূজার ছুটিতে বেড়াতে এসে প্রাণ হারিয়েছেন
একই পরিবারের ছয়জন। নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত
হয়েছেন অন্তত ছয়জন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো
হয়েছে।শনিবার
সকাল সাতটার দিকে উখিয়ার ইনানী
এলাকার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। আগুনে
রিসোর্টটির পুরো স্থাপনা পুড়ে
যায়। দীর্ঘ চেষ্টার পর সকাল ১১টার
দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে
ফায়ার সার্ভিস। পরে উদ্ধারকর্মীরা তল্লাশি
চালিয়ে প্রথমে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করেন। দুপুরের পর বাথরুম থেকে
আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।ফায়ার
সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, উখিয়া
উপজেলা প্রশাসন ও কক্সবাজার সদর
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব তথ্য নিশ্চিত
করেছে।ঘটনাটি
আরও মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে রিসোর্টটির
নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উঠে আসা
তথ্যে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স
অধিদপ্তর জানিয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত
জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ
উল্লেখ করে সতর্কতামূলক নোটিশও
দেওয়া হয়েছিল।গ্যাস
সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর
ছড়িয়ে
পড়ে
আগুনস্থানীয়
বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী,
রিসোর্টের সামনের অংশে ছিল একটি
রেস্তোরাঁ। ওই রেস্তোরাঁর ভেতর
দিয়ে রিসোর্টে প্রবেশ ও বের হওয়ার
পথ ছিল। রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে
বড় আকারের এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার মজুত ছিল। সেখান
থেকেই আগুনের সূত্রপাত এবং পরে সিলিন্ডার
বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে বলে
তাঁদের ধারণা।আগুন
লাগার পর রেস্তোরাঁর সামনের
পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়
রিসোর্টে থাকা পর্যটকেরা বের
হতে বিপাকে পড়েন। কয়েকজন জানালা ভেঙে ও পাশের
নালায় লাফ দিয়ে প্রাণে
বাঁচেন।তবে
আগুনের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে
নিশ্চিত হতে পারেনি ফায়ার
সার্ভিস। রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ।
আটকের আগে তিনি দাবি
করেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত
হয়ে থাকতে পারে। পরে এসি ও
গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন দ্রুত
ছড়িয়ে পড়ে বলে তাঁদের
ধারণা।ফায়ার
সার্ভিসের চারটি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে
অংশ নেয়। পাশাপাশি বিজিবি,
এসআরবি ও পুলিশ সদস্যরা
উদ্ধারকাজে সহায়তা করেন।একই
পরিবারের ছয়জনের মৃত্যুএই
অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ছয়জনের
মৃত্যু হয়েছে। দুর্গাপূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে
এসেছিলেন আশিকুল ইসলাম। তাঁদের শনিবার ঢাকায় ফেরার কথা ছিল।আশিকুলের
ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে আগুন দেখে তাঁর
স্ত্রী তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে
দেন। এরপর পাশের কক্ষে
থাকা স্বজনদের ডাকতে যান তিনি। কিন্তু
আর ফিরে আসতে পারেননি।
আশিকুল জানালা ভেঙে বের হয়ে
প্রাণে বাঁচেন।কক্সবাজার
সদর হাসপাতালে কান্নায় ভেঙে পড়ে আশিকুল
বলেন, ‘আর ১০টা মিনিট
সময় পেলে আমার স্ত্রীও
নামতে পারত।’নিহতদের
মধ্যে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী ইসরাত
জাহান মালিহা (৩০), শ্যালিকা লায়লা
জাহান নাবিলা (২৭), মিলিতা মেহজাবিন
আলভী (২৩), ফারিহা কবির
(৩৩), শিশু ফায়জান আহমেদ
(৫) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী।নিহত
নাফিজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা
ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের
শিক্ষার্থী ছিলেন। নাবিলা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী। মিলিতা মেহজাবিন আলভী ইস্ট ওয়েস্ট
ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ছিলেন।ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি সাদিক কায়েম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নাফিজসহ
একই পরিবারের ছয় সদস্যের মৃত্যুর
তথ্য জানান। এ ঘটনায় শোক
প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।তিন
বান্ধবীর একজন
নিখোঁজসাভার
থেকে দুই বান্ধবীকে নিয়ে
কক্সবাজার বেড়াতে এসেছিলেন আইরিন জাহান মিম। তাঁরা শুক্রবার
টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। শনিবার ভোরে আইরিন ও
তাঁর এক বান্ধবী সৈকতে
ঘুরতে বের হন। তাঁদের
আরেক বান্ধবী নাসরিন আক্তার রিসোর্টের কক্ষে ছিলেন।আইরিনের
ভাষ্য, সৈকতে থাকা অবস্থায় হঠাৎ
রিসোর্টে আগুন দেখতে পান
তাঁরা। এর পর বিকট
বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
সেই সময় থেকে নাসরিনের
কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে
না।নাসরিন
সাভারের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের
শিক্ষিকা। তাঁর বাবা মো.
মোস্তফা কামাল এবং মা নাছিমা
আক্তার।নালায়
লাফ
দিয়ে
প্রাণে বাঁচেন দম্পতিঢাকার
মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে
রিসোর্টটিতে উঠেছিলেন আবদুল মান্নান। শুক্রবার সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের আরও
দুই দিন থাকার পরিকল্পনা
ছিল।মান্নান
জানান, শনিবার সকালে ঘুম ভেঙে দেখেন
চারপাশ অন্ধকার। কক্ষের দরজা খুলে বাইরে
গিয়ে আগুনের পরিস্থিতি বুঝতে পারেন। পরে বারান্দা থেকে
পাশের নালার মতো জায়গায় লাফ
দিয়ে তিনি ও তাঁর
পরিবারের সদস্যরা প্রাণে বাঁচেন।এ
ঘটনায় আহতদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক
শাহাব উদ্দিন (৩১), তাঁর স্ত্রী
চিকিৎসক নাফিজা নাওয়ার খান (২৯), আবদুল
মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০),
মাসুদ (৩০) ও সামিদা
(৩২) রয়েছেন। আহতদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া
হয়। তাঁদের কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো
হয়েছে।অনুমোদন ছাড়াই
চলছিল
রিসোর্টফায়ার
সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, টুপটুপ রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছিল না। গত
জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ
উল্লেখ করে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক
করা হয়েছিল।রিসোর্টটিতে
মোট নয়টি কক্ষ ছিল
বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র
জানিয়েছে। ইটের দেয়াল, টিনের
ছাউনি ও কাঠের পাটাতনে
তৈরি স্থাপনাটি আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।পাঁচ
সদস্যের তদন্ত
কমিটিঅগ্নিকাণ্ডের
কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটি আগুনের সূত্রপাত, প্রাণহানির কারণ এবং রিসোর্টটির
নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে।কক্সবাজারের
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান
জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করে মরদেহ পরিবারের
কাছে হস্তান্তরের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা
করা হবে। তদন্ত শেষ
না হওয়া পর্যন্ত আগুনের
প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত
হওয়া সম্ভব নয় বলেও জানান
তিনি।