Ctn Tv

বিটিআই ভবনে প্রাণ গেল শ্রমিকের, লাশ হস্তান্তরে অনিয়ম

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গত ছয় থেকে সাত মাসে ওই ভবনে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এসব ঘটনায় একজন নির্মাণশ্রমিক নিহত এবং অন্তত দুজন পঙ্গুত্ববরণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।সর্বশেষ গত ৬ আগস্ট লোহার রড উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুতের তারে লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত হন শহিদুল ইসলাম (৩০)। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হন আরেক শ্রমিক এরশাদুল। ঘটনাটি ঘটে বসুন্ধরার কে-ব্লকের এভিনিউ-৫-এর ১৭৬ ও ১৭৭ নম্বর প্লটে বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেডের (বিটিআই) নির্মাণাধীন ভবনে।প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ভবনের সামনে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইন থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল না। শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সেফটি নেট, ফল প্রটেকশন, রেইলিং বা ব্যারিকেড এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) ব্যবহারের ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত ছিল না। এর আগে দুর্ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।দুর্ঘটনার পরও হাসপাতালে নিতে দেরিপ্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ৬ আগস্ট দুপুরে ভবনের চতুর্থ তলায় কাজ করছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। এ সময় একটি লোহার রড ভবনের সামনে থাকা উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুতের তারে লাগে। এতে শহিদুল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দোতলার কার্নিশে ছিটকে পড়েন। আরেক শ্রমিক এরশাদুল ভবনের নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন।অভিযোগ রয়েছে, দুর্ঘটনার পর আহত দুজনকে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে না নিয়ে ভবনের ভেতরে দীর্ঘ সময় রাখা হয়। একপর্যায়ে শহিদুল মারা গেলে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে এরশাদুলকেও হাসপাতালে নেওয়া হয়।শহিদুলের বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা এলাকায়। তাঁর তিনটি শিশুসন্তান রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাঁর পরিবার বিপাকে পড়েছে বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।অন্যদিকে এরশাদুলের হাত-পা ভেঙে গেছে। কোমরেও গুরুতর আঘাত পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তাঁর চিকিৎসা চলছে বলে জানা গেছে।আগেও ঘটেছে দুর্ঘটনাস্থানীয় বাসিন্দা ও নির্মাণশ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৭ জুন একই নির্মাণাধীন ভবনে লোহার রড বিদ্যুতের তারে লেগে আরেক শ্রমিক গুরুতর আহত হন। তাঁর হাত-পা ভেঙে যাওয়ায় তিনি পঙ্গুত্ববরণ করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। ওই ঘটনার একটি ভিডিও প্রতিবেদকের কাছেও রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।এ ছাড়া ভবন নির্মাণের শুরুর দিকে আরও একজন শ্রমিক নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন আশপাশের ভবনের নির্মাণশ্রমিক ও কেয়ারটেকাররা। তবে ওই শ্রমিকের পরিচয় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর অনেক শ্রমিককে অন্য প্রকল্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয় অথবা বাড়িতে পাঠানো হয়। এ কারণে ঘটনার বিষয়ে শ্রমিকদের অনেকে কথা বলতে চান না। তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।ঘটনাস্থলে গিয়ে মিলেছে ভিন্ন বক্তব্য৬ আগস্টের দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্মাণাধীন ভবনের ফটক বন্ধ পাওয়া যায়। সাংবাদিক পরিচয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সেখানে থাকা ব্যক্তিরা জানান, কেউ মারা যাননি; দুজন সামান্য আহত হয়েছেন এবং তাঁদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প প্রকৌশলী মো. ওয়াদুদ নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকার বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।পরে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার দিনই বিটিআই কর্তৃপক্ষ নিহত শ্রমিকের পরিবারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করেছে।লাশ হস্তান্তর ও অপমৃত্যু মামলা নিয়ে প্রশ্ননিহত শহিদুলের সুরতহাল প্রতিবেদনে তাঁর বাবা নেসার উদ্দিন ও মা ফরিদা বেগমের নাম রয়েছে। লাশ শনাক্ত ও গ্রহণকারী হিসেবে ফরিদুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে শহিদুলের আপন ভাই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।তবে অভিযোগ উঠেছে, অন্য একজনকে শহিদুলের ভাই পরিচয় দিয়ে অপমৃত্যু মামলা এবং লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভাটারা থানার পুলিশের সঙ্গে বিটিআইয়ের যোগসাজশের অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।এ বিষয়ে প্রকল্প প্রকৌশলী ওয়াদুদের বক্তব্যেও অসঙ্গতি দেখা যায়। প্রথমে তিনি বলেন, নিহতের ভাইয়ের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়নি। পরে আবার বলেন, ভাইয়ের কাছেই লাশ দেওয়া হয়েছে।ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। একই ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা হতে পারে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।তবে লাশ শনাক্তকারী ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে ওসি মাজহারুল ইসলাম এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই বেলালের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগদুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া এক সাংবাদিককেও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওই সাংবাদিকের দাবি, একটি বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে তাঁকে গালাগাল করা হয় এবং তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের হুমকি দেওয়া হয়।এ ছাড়া তাঁর বাসার আশপাশে গিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে একটি কালো রঙের মাইক্রোবাসে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর ও এক শুভাকাঙ্ক্ষীর বাসার সামনে অবস্থান করে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করেছেন বলেও তাঁর দাবি।এ ঘটনায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে তিনি ভাটারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।ওই সাংবাদিকের অভিযোগ, ভবনটির সামনে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইন থাকলেও সেখানে নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল না। ২৭ জুনের দুর্ঘটনার পর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হলে ৬ আগস্টের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারত।বিটিআইয়ের বক্তব্য পাওয়া যায়নিনির্মাণাধীন ভবনে একাধিক দুর্ঘটনা, শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং নিহত শহিদুলের পরিবারকে সহায়তার বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিটিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাইজুর রহমান খানকে একাধিকবার ফোন করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি। মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।প্রকল্প প্রকৌশলী মো. ওয়াদুদ বলেন, দুর্ঘটনার দিনই নিহত শ্রমিকের পরিবারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।তবে শহিদুলের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিটিআই কর্তৃপক্ষ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি এবং কোনো সহযোগিতাও করেনি।একই নির্মাণস্থলে একাধিক দুর্ঘটনা, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির অভিযোগ, আহত শ্রমিকদের হাসপাতালে নিতে বিলম্ব, লাশ হস্তান্তর এবং অপমৃত্যু মামলা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন- সব মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।বিশেষ করে, আগের দুর্ঘটনার পরও কেন নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি, নির্মাণস্থলে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইনের পাশে কী ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল এবং দুর্ঘটনার পর আহত শ্রমিকদের চিকিৎসায় কেন বিলম্ব হলো- এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি সংশ্লিষ্টদের।

বিটিআই ভবনে প্রাণ গেল শ্রমিকের, লাশ হস্তান্তরে অনিয়ম