Ctn Tv

কুষ্টিয়ায় রবীন্দ্রনাথের ব্যবসায়ী জীবনের স্মৃতিচিহ্ন টেগর লজ

কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক টেগর লজ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামের সঙ্গে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের সম্পর্ক সবারই জানা। তবে কবির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কুষ্টিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এই টেগর লজ। সাহিত্যচর্চার বাইরে ব্যবসা, শিল্প উদ্যোগ এবং স্বদেশি ভাবনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পৃক্ততার সাক্ষ্য বহন করছে ভবনটি।ব্যবসায় নামেন রবীন্দ্রনাথ১৮৯৫ সালে ভুসিমাল ও পাটের ব্যবসার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর দুই ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহায়তায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘টেগর অ্যান্ড কোম্পানি’। ব্যবসার কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কুষ্টিয়ায় অবস্থানের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠানের একাংশে নির্মাণ করেন দ্বিতল টেগর লজ।টেগর লজকে ঘিরে শুধু ব্যবসায়িক কার্যক্রমই পরিচালিত হয়নি। এখানে ভুসিমালের ব্যবসার পাশাপাশি আখমাড়াইয়ের কল এবং পাটের গাঁট তৈরির কল স্থাপন করা হয়েছিল। অর্থাৎ ব্যবসার সঙ্গে শিল্প উৎপাদনেরও একটি সংযোগ তৈরি হয়েছিল এই স্থাপনাকে ঘিরে।স্বদেশি ভাবনায় তাঁতশালাপরবর্তী সময়ে স্বদেশি আন্দোলনের চেতনায় টেগর লজকে কেন্দ্র করে একটি বড় তাঁতশালা গড়ে তোলা হয়। দেশীয় পণ্য ও শিল্পের প্রসারে স্বদেশি ভাবনার যে প্রবাহ তৈরি হয়েছিল, টেগর লজ সেই সময়ের একটি স্মারক হিসেবেও বিবেচিত হয়।রবীন্দ্রনাথের জীবনে সাহিত্য ও জমিদারি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ব্যবসা ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের যে অধ্যায় ছিল, টেগর লজ সেই অধ্যায়কে সামনে নিয়ে আসে।ব্যবসায় লোকসান, বাড়ে ঋণ‘টেগর অ্যান্ড কোম্পানি’র ব্যবসা প্রথমদিকে ভালো চললেও পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানে পড়তে থাকে। পাটের ব্যবসায় এসে রবীন্দ্রনাথ একসময় লাখ টাকারও বেশি ঋণগ্রস্ত হন।ব্যবসা পরিচালনার পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত খুলনার ফুলতলার দক্ষিণডিহির উদ্যমী যুবক যজ্ঞেশ্বরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ব্যবসায় রবীন্দ্রনাথের এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের তুলনামূলক কম আলোচিত একটি অধ্যায়।কবির বিশ্রামের জায়গাটেগর লজের গুরুত্ব শুধু ব্যবসায়িক ইতিহাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কুষ্টিয়ায় যাতায়াতের সময় রবীন্দ্রনাথ এখানে বিশ্রাম নিতেন এবং কখনো রাতও কাটিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।এ কারণে ভবনটির সঙ্গে কবির ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতিও যুক্ত হয়েছে। ফলে টেগর লজ একদিকে যেমন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের স্মারক, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের কুষ্টিয়ায় অবস্থানেরও একটি স্মৃতিচিহ্ন।অযত্ন থেকে সংস্কারসময়ের প্রবাহে টেগর লজ অন্যের মালিকানায় চলে যায়। দীর্ঘদিন ভবনটি অযত্নে পড়ে ছিল। পরে কুষ্টিয়া পৌরসভার উদ্যোগে এটি সংস্কার করা হয়। এখানে জাদুঘর ও লাইব্রেরি স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়।ঐতিহাসিক স্থাপনাটির যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের জীবনের এই কম আলোচিত অধ্যায় নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।শিলাইদহের বাইরে অন্য এক রবীন্দ্রনাথকুষ্টিয়া বলতেই রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। সেখানে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির বিস্তৃত স্মৃতি রয়েছে। কিন্তু টেগর লজ সামনে নিয়ে আসে রবীন্দ্রনাথের জীবনের অন্য একটি দিক।তিনি শুধু কবি বা সাহিত্যিক ছিলেন না; ব্যবসা, শিল্প ও স্বদেশি উদ্যোগের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। কুষ্টিয়ার টেগর লজ সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত স্থান দেখতে কুষ্টিয়ায় আসা দর্শনার্থীদের কাছে তাই শিলাইদহের পাশাপাশি টেগর লজও হতে পারে আগ্রহের একটি স্থান। ইতিহাস, সাহিত্য ও স্থাপত্যের এই সমন্বিত স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ করা গেলে কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী পর্যটন মানচিত্রেও টেগর লজ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কুষ্টিয়ায় রবীন্দ্রনাথের ব্যবসায়ী জীবনের স্মৃতিচিহ্ন টেগর লজ