Ctn Tv

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার: শামা ওবায়েদ

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন শুরু করতে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে সরকার। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘ, চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আরও সক্রিয় ভূমিকা চায় ঢাকা।পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি জানান, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতিবছর ৩০ হাজারের বেশি শিশুর জন্ম হচ্ছে। ফলে সংকটের ব্যাপ্তি ক্রমেই বাড়ছে।শামা ওবায়েদ বলেন, অতীতে বিএনপি সরকারের সময় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল, তা কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকার সংকট সমাধানের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়কার কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোও নতুন করে কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।তিনি বলেন, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল পরিস্থিতি অব্যাহত না রেখে প্রত্যাবাসন শুরু করাই সরকারের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা অন্তত প্রত্যাবাসন শুরু করতে চাই।’অতীতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগপররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার থেকে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের নথি অনুযায়ী, তৎকালীন বার্মার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির আওতায় ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয়।শামা ওবায়েদ বলেন, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ওই সময় প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল। পরে ১৯৯২ সালে আরও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। খালেদা জিয়ার সরকারের সময় তাঁদের মধ্যে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার জনকে প্রত্যাবাসন করা হয়।তাঁর মতে, এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, মিয়ানমারের সঙ্গে ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকলে প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি সম্ভব।২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক অনুপ্রবেশের সময় খালেদা জিয়ার মানবিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, সে সময় চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করেও সীমান্তে আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি ও আশ্রয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় বাড়ছে চাপশামা ওবায়েদ বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী এ সংকট দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে আশ্রয়শিবিরের আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এর প্রভাবের মুখে পড়ছে।একই সময়ে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে আসায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আশ্রয় ও অন্যান্য জরুরি সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে।জাতিসংঘের আরও সক্রিয় ভূমিকা চায় ঢাকাপররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতীতের প্রত্যাবাসন উদ্যোগগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম পার্থক্য হলো আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের মাত্রা। আগের উদ্যোগগুলোতে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। ওই সময় মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত সমঝোতা হলেও বড় পরিসরে সংগঠিত প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।বর্তমান সরকার জাতিসংঘ, চীন, আসিয়ানভুক্ত দেশ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং অন্যান্য প্রভাবশালী অংশীদারকে আরও ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করতে চায়। শামা ওবায়েদ আশা প্রকাশ করেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ এবার আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে।জাতিসংঘে পাঁচ দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীররোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার। গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ববৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন।প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে-·        দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি।·        বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ।·        পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।·        ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি জোরদার করা।·        আন্তসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান তাঁদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া। সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় এর সমাধানও শেষ পর্যন্ত সেখানেই নিহিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহের সঙ্গেও রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।চীন ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতা চায় বাংলাদেশশামা ওবায়েদ বলেন, মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব থাকায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দেশটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনের মতো আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করছে বাংলাদেশ। তুরস্কসহ অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশও বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে বলে জানান তিনি।তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃপক্ষের উপস্থিতির কারণে সংকট সমাধান আগের চেয়ে জটিল হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে ঢাকারাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ। শামা ওবায়েদ বলেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করা এখনো কঠিন। তবে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক দুই মাধ্যমেই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।প্রত্যাবাসনের যোগ্য রোহিঙ্গাদের যাচাই ও পরিচয় শনাক্তকরণের কাজও চলছে। এ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে মিয়ানমারকে বারবার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।শামা ওবায়েদ বলেন, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের পাশাপাশি জাতিসংঘের আরও সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের চাপ অব্যাহত রাখবে সরকার। রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল আশ্রয় দিয়ে যাওয়া নয়, বরং তাঁদের নিজ দেশে ফেরার বাস্তব পরিবেশ তৈরি করাই বাংলাদেশের লক্ষ্য। সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার: শামা ওবায়েদ